২৫ শে মার্চ সিদ্ধান্তের রাত ও একজন মেজর জিয়া

0
533

২৫ মার্চ, রাত দশটা। সুবেদার মেজর ইতবরকে ডেকে পাঠিয়ে, ক্যাপ্টেন রফিক, হালি শহরে ইপিআর হেড কোয়ার্টারে তার অফিসের সামনে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। একটু আগে তিনি ক্যাপ্টেন হায়াত নামে পাকিস্তানি এক অফিসারকে বন্দী করে ওয়্যারলস সেটশনের দখল নিয়েছেন। আশ্চর্য এই অস্থিরতার মধ্যেও ক্ষুধা তাঁকে ভোগাচ্ছে। রাত সাড়ে আটটায় সারসন রোডের বাড়িতে ক্যাপ্টেন মুসলিমের সাথে তিনি যখন সবে ডিনারে বসেছেন, ঠিক তখনই সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাড়িতে ঢুকেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা ডাঃ জাফর। কোন ভূমিকা না করে বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা, মনেহয় ভেস্তে গ্যাছে, শুনলাম গা ঢাকা দিয়ে এয়ারপোর্টে ভেগেছে ইয়াহিয়া’।ভাতের থালার উপর থেমে গিয়েছিলো রফিকের হাত,
– ঢাকা থেকে তো কোন খবর পাচ্ছি না!
– ‘খবর পাবেন কি ভাবে? শুনেছি, সন্ধ্যার পরপরই, আপনাদের ওয়্যারলেসের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানিদের হাতে চলে গিয়েছে।
রফিকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিলো, বলেছিলেন, ‘অসম্ভব! আমি বিকেলেও আমার অপারেটরদের ব্রিফ করেছি’। জাফর যখন বললেন ‘আমি এখানকার কথা বলছিনা। ঢাকার কথা বলছি’। নিমেষে পরিষ্কার হয়ে গেলো সবকিছু। ডাক্তার জাফরকে খবরটা ইবিআরসি আর এইটথ বেঙ্গলে পৌছে দিতে বলে, তিনি ভাত রেখে বেরিয়ে পড়েছিলেন। গতকাল কর্নেল এমআর চৌধুরি আর মেজর জিয়ার সাথে কথা বলার পর, তিনি সবকিছু আগাগোড়া ভেবেছেন, সিনিয়ারদের কথা অযৌক্তিক মনে হয়নি। ‘দ্য ডায়ালগ ইজ নট ইয়েট ওভার, লেট’স ওয়েট ফর শেখ সাহেব’স ডিসিশন। কমান্ড্যান্টের সাথে মজিবারের যোগাযোগ আছে, থ্রু ওসমানী’।
তবে আজ জাফরের কাছে ঢাকার খবর শোনার পর মনে হলো, নির্দেশের জন্যে আর অপেক্ষা করার কোন মানে নেই। ঝড়ের গতিতে তিনি ওয়্যারলেস স্টেশন দখলে করে নিয়েছিলেন। হালিশহরে, ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টার দখল করা যে সহজ হবে না, এ তিনি আগেই জানতেন। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, অবাঙালিদের কিছু বুঝতে না দিয়ে, বাঙালি সৈনিকদের সশস্ত্র রাখতে হবে। সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্ণেল আজিজ যখন বিভিন্ন অযুহাতে বাঙালি সৈনিকদের দূরে পাঠিয়ে দিয়ে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে অবাঙালি সৈনিকদের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, রফিক তখন কৌশলে কোয়ার্টার গার্ড, কোত, আর গোলাবারুদের আশে পাশে ডিউটি দিয়ে বাঙালি সৈনিকদের সশস্ত্র রাখার চেষ্টা করেছেন। লোকবল যতই থাকুক, অস্ত্রের দখল রাখতে পারলে জিততে কতক্ষণ। আজ রাতেও এসব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাঙালি সৈনিকদের বেশি রাখা হয়েছে। অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।
ইতবার কে আসতে দেখে তিনি অফিসে ঢুকলেন। সুবেদার মেজরের বয়স হয়েছে। সৈনিকদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ তিনি। ঘুম থেকে উঠে আসায় তাঁর চোখে মুখে ঘুম ঘুম ভাবটি বেশ স্পষ্ট। রফিক তাঁকে বসতে বললেন, ‘খুব অসময়ে আপনাকে ডাকতে হলো, এসএম সাহেব’।
হাত কচলাতে কচলাতে ইতবার বললেন, ‘কোন ব্যাপার নয় স্যার আমি তো জেগেই থাকি’।
রফিক বললেন, ‘শহরের কথা কিছু শুনেছেন?’ ইতবার তার উত্তর পুরোপুরি দেবার আগেই, পাশের রুম থেকে চার জন সৈন্য এসে রাইফেলের বেয়োনেট তার বুকের উপর ধরলো। রফিক শুধু বললেন, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো, ভাগনেকা কোশিস মাত কারনা’। হতভম্ব হয়েগেলেন সুবেদার মেজর। তাঁর হাত বেধে নিয়ে যাওয়া হলো।
একটু পর ‘সিগন্যাল জেসিও’ পাকিস্তানি সুবেদার মোবিনকে ডাকা হলো।এর মধ্যে অবাঙালি সৈনিকদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।তাদের মধ্যে অনেকেই বুঝতে পেরেছে, তাদের বিপক্ষে কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু অস্ত্রাগার বাঙালিদের দখলে থাকায় কিছু করতে পারছে না।
সুবেদার মোবিন এলেন আতংকিত অবস্থায়। প্রায় সাথে সাথেই মেজর ইকবালের ফোন এলো। ইপিআর ১১ উইং এর পাকিস্তানি অধিনায়ক ইকবাল, রফিককে বললেন, এত রাতে অফিসে কী করো?
– গার্ড চেক করতে এসেছিলাম স্যার।
– সব ঠিক ঠাক?
– জী স্যার?
– সিগন্যাল জেসিওকে খবর দিয়েছি সেই কখন, কোন পাত্তা নেই
– মনে হয় ঘুমাচ্ছে স্যার, কথা বলবেন?
– ফোনটা দাও না!
সাথে সাথে মোবিনকে না দিয়ে, রফিক বললেন, ‘আমি ডাকতে পাঠিয়েছি একটু অপেক্ষা করেন’। এর পর সময় কাটানোর জন্যে ইকবালের সাথে একথা সেকথা হতে থাকলো। এক পর্যায়ে, ইকবাল বললেন,
– হায়াতের ফোন কেউ ধরছে না কেন?
একটা ছোট্ট ধাক্কা খেলেন রফিক। কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্যাপ্টেন হায়াতকে বন্দী করেছেন। বললেন, ‘ওর ফোন খারাপ, এই মাত্র ওর ওখান থেকে এলাম, সুন্দর এক কাপ চা খাওয়ালো’।‘ইয়ার কভি, হামকো ভি লে চলো চায়ে পিনেকে লিয়ে’ মেজর ইকবাল বললেন।
ততক্ষণে সুবেদার মোবিনকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। ক্যাপ্টেন রফিকের কাছে তাঁকে নিয়ে আসা হলো, রফিক বললেন, ‘মেজর ইকবাল সাহেবের সাথে এখন, ফোনে কথা বলবেন, আমি যা বলবো তাঁর বাইরে একটা শব্দ যেন না শুনি’। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রাজী হলেন মোবিন। ক্যাপ্টেন রফিক, নম্বর ডায়াল করে তার কানের কাছে ধরলেন। মোবিন বললেন, স্লামালাইকুম স্যার, সুবেদার মোবিন বলছি
– মোবিন সাব, আপকা পাস ঔর কোয়ি হ্যায়? রফিক, হাত দিয়ে মাউথপিস চেপে ধরে বললেন,
বলেন ‘নেই’। সুবেদার মোবিন তাই বললেন। ইকবাল বললেন আমি তো একটু আগে ওনার সাথে কথা বললাম? এবার মোবিনকে শিখিয়ে দেওয়া হল, ‘এই মাত্র এসএম স্যার কে নিয়ে বাইরে গেলেন’।
– কোই গড়বড়?
– নেহি সাব।
খুব অনুগত হয়ে শিখিয়ে দেওয়া জবাব দিলেন সিগন্যাল জেসিও।
একে একে অন্য জেসিওদেরকেও বন্দি করা হলো। বন্দী হলো অন্যান্য সকল অবাঙালি সৈনিক।পৌনে এগারটার সময়, বাঙালি সুবেদার জয়নাল জানালেন সব কাজ শেষ হয়েছে। এয়ারপোর্টসহ চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সৈনিক যাবার নির্দেশ দিয়ে ক্যাপ্টেন রফিক রেলওয়ে হিলের দিকে রওনা হলেন।


জিয়াকে পোর্টে রওনা করিয়ে দিয়ে জাঞ্জুয়া বাসার পথ ধরলেন। মেজর শওকতও গাড়িতে উঠলেন, তিনি যাবেন এইটথ বেঙ্গলের অফিসার্স মেসে। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান অফিসের দোতলায় উঠে গেলেন, অলির সাথে এক কাপ চেয়ে ডিউটিতে যাবেন। সিও তাঁকে এম্বারকেশন ইউনিটে যেতে বলেছেন। চারিদিকে যা অবস্থা! অলির সাথে একটু আলোচনা করা দরকার। ক্যাপ্টেন অলি চাকরিতে জুনিয়ার হলেও, বয়সে একটু বড়। বিভিন্ন কারণে সিনিয়ার অফিসারদের সাথে তাঁর যোগাযোগটা ভালো। চট্টগ্রামের সবচেয়ে সিনিয়ার বাঙালি অফিসার, কর্ণেল এমআর চৌধুরির তিনি ইউনিট অফিসার। মার্চের শুরুতে বাঙালি অফিসাররা যখন তাদের করণীয় নিয়ে একটু দোদুল্যমান ছিলো, সে সময় সিনিয়ার জুনিয়ারদের মধ্যে তাঁকে একটু দূতিয়ালিও করতে হয়েছে।খালেকুজ্জামানের সাথে কথা জমে আসার আগেই টেবিলের উপরের ফোনটি জীবন্ত হয়ে উঠল, রাত তখন এগারোটার কাছাকছি।ওপার থেকে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের কাদের সাহেব জানালেন, ‘ঢাকায় আর্মী নেমে গেছে। রাজার বাগে ভীষণ গোলমাল হচ্ছে, ইপিআরেও গোলাগুলি হচ্ছে’। কাদের সাহেব খালেকুজ্জামান আর অলি দু’জনেরই পরিচিত। ক্যাপ্টেন অলির সাথেও কথা হলো তাঁর। খালেক বললেন,
– খবরটা টু আইসিকে দেওয়া দরকার না?
– হ্যা, স্যার তো তাই বলে গিয়েছিলেন, স্যারের সাথে সেট আছে?
– সেটে খবর দেওয়া, যাবে না। আদার্স আর অলসো ইন দ্য সেইম নেট, আই বেটার টেইক আ পিক আপ, ইফ আই ক্যান রিচ হিম। তুমি এদিকে সব ঠিক রাখো.
ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান দ্রুত সুবেদার মাহাবুবকে ডেকে বললেন, ‘সৈনিকদের তাড়াতড়ি ফলইন করান, হাতিয়ার গোলাবারুদ ইস্যু করে রেডি থাকেন, আমাদের যাওয়া লাগতে পারে’। এরপর, একজন ল্যান্স নায়েক আর দু’জন সৈনিক নিইয়ে একটি পিক আপে রওনা হয়ে গেলেন বন্দরের পথে। ল্যান্স নায়েক শফি নিচে ডিউটি করছিলেন, তাঁকে বললেন, ‘ হুশিয়ার থাইকো, কোন কিছু হলে সাথে সাথে, ডিউটি অফিসারকে জানাইবা। উনি উপরে আছেন’।
ব্যাটালিয়নে তখন আর কোন অফিসার নেই। সিও বাসায়, টু আইসি বন্দরে, মেজর শওকত মেসে অন্যরা সবাই বিভিন্ন জায়গায় ডিউটিতে। অলি আহমেদ এক মুহুর্ত দেরী না করে,ইউনিটের সৈনিকদের একত্রিত করে নায়েব সুবেদার হামিদকে পাঠালেন, সবাইকে নিয়ে সিডিএ মার্কেটের উপর অবস্থান নিতে।
ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের টেনশন বেড়ে যাচ্ছিলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যরিকেড, টু আইসিকে খবরটা দিতে না পারলে ম্যাসাকার হয়ে যাবে। তি্নি দামপাড়ার ব্যারিকেডটা সরানোর জন্যে নেমে পড়লেন। এখনও অনেক দূর, ‘স্যার যদি পোর্টে পৌছে যান তাহলে ব্যাপারটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে’। মাত্র তিন জন সৈনিক নিয়ে ব্যারিকেড সরানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি বললেন, জলদি করো।
জিয়াউর রহমান পুরো ব্যাপারটা বিশ্লেষণের চেষ্টা করছিলেন। আগ্রাবাদ রেলওয়ে ওভারব্রীজের কাছে তাঁর গাড়ি থেমেছে। ব্যরকিকেডের জন্যে আগানো যাচ্ছে না। ইচ্ছে করলে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দু’জনকে নামিয়ে ব্যারিকেড সরানোর কথা বলতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই মুহুর্তে ওদের কাছ থেকে একটু আলাদা থাকা দরকার।তিনি ধীর পায়ে রাস্তায় হাটতে হাটতে ভাবছিলেন, তাঁকে পোর্টে পাঠিয়ে সিওর কী লাভ? এক হতে পারে অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা, আর অন্য হতে পারে আনসারির কাছে কোন অজুহাতে আটকে রাখা।একটি বিষয় চিন্তা করে তিনি একটু স্বস্তি পেলেন। পোর্টে এখনও এইটথ বেঙ্গলের একটি কোম্পানি আছে। প্রয়োজনে তাঁদের ব্যবহার করা যেতে পারে, শওকত ইউনিট সামলাতে পারবে, যদি নেভী, ২০ বালুচ বা ২ কমান্ডো না আসে। এর মধ্যে যদি ইপিআরের সাপোর্ট পাওয়া যায়, দ্যাট’স এনাফ। হঠাত একটা গাড়ির শব্দে ফিরে তাকালেন তিনি।
একটি পিক আপ থামলো তাঁর গাড়ির কাছে., পিক আপ থেকে ক্যাপ্টেন খালেক কে নামতে দেখে খুব একটা অবাক হলেন না। শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন তাঁর দিকে। খালেক বললেন, স্যার, দে হ্যাভ ক্র্যাকড ডাউন, কন্ডিশন এট ঢাকা ইজ ভেরি সিরিয়াস। দে হ্যাভ এটাকড ইপিআর ক্যাম্প এন্ড পুলিশ লাইন… এক মুহুর্ত ভাবলেন জিয়া, তারপর বললেন, ‘উই রিভোল্ট। ডোন্ট টেল এনিথিং টু আজম অর হুমায়ুন আই উইল টেল দোজ ঘুঘুজ হোয়াট আই নিড টু সে। গো টু ইউনিট এন্ড টেল অলি টু প্রিপেয়ার দি ইউনিট’।
ক্যাপ্টেন খালেকের মনে হলো, তিনি করার মত একটি কাজ পেয়েছেন। ড্রাইভারকে বললেন জলদি চলো। আসার সময় বেরিকেড সরিয়ে আসায় উড়ে চললো তাঁর পিকআপ। জিয়া গাড়িতে ফিরে ভালো মানুষের মত বললেন, গাড়ি ঘোরাও, আমাদের ফেরত নিয়ে যেতে সিও, ক্যাপ্টেন সাহেবকে পাঠিয়েছেন।নেভীর ট্রাকটাও মুখ ঘুরালো সিডিএ মার্কেটের দিকে


এতদ্রুত ক্যাপ্টেন সাহেবকে ফেরত আসতে দেখে একটু অবাক হলেন ল্যান্স নায়েক শফি। এর আগে তিনি বেরিয়ে যাবার পরপরই কিউএম সারা ব্যাটালিয়ন ফলইন করিয়ে সিডিএ মার্কেট সহ আরও অনেক জায়গায় লাগিয়েছেন।ক্যাপ্টেন আহমেদ আলীকে গ্রেফতার করে কোয়ার্টার গার্ডে ভরেছেন। পাকিস্তনি ক্যাপ্টেন বেচারা আধো ঘুম আধো জাগরণে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোয়ার্টার গার্ডে ঢুকে পড়েছেন, স্ট্রাইপড স্লিপিং স্যুটে তাঁকে লাগছে জেল খানার কয়েদির মত।খালেক গাড়ি থেকে নেমেই, দৌড়ে দো’তলায় উঠতে উঠতে তাঁকে বললেন ‘হুসিয়ার রাহে না, টু আইসি আসছেন’।খালেক সাহেবকে কখনও উর্দু বলতে শোনেনি শফি। এসব হচ্ছে কী?
একটু পর জিয়া এসে দেখলেন, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান জনাপাচেক, সৈনিক নিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমেই পাকিস্তানি অফিসার দু’জনকে গ্রেফতার করার ইশারা করে বললেন, ‘খালেক, গেট এ জিপ’। পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেফতার করতে দেখে, ট্রাকের বাঙালি সৈনিকরা উৎফুল্ল হয়ে উঠল, কেউ কেউ জয় বাংলা বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো, তাদের থামাতে ইশারা করলেন, জিয়া, উৎসব করার সময় এখনও আসেনি। আশেপাশের পাকিস্তানিরা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। অলি আহমেদ নীচে নামার আগেই, সিও’র জীপ এসে হাজির হল, সিও কে নামিয়ে দিয়ে খানিক আগে সেটি ফেরত এসেছে। জিয়া গাড়িতে উঠে বসলেন, সিও’র সাথে বোঝাপড়া বাকি আছে। ততক্ষণে অলি নেমে এসেছেন, ‘ বললেন, স্যার এসকর্ট নিয়ে যান’। জিয়া দাঁড়ালেন না। ড্রাইভারকে বললেন, ‘আল হামরা’
লেঃ কর্ণেল জাঞ্জুয়ার সরকারি বাসভবন ‘আল হামরা’। জিয়াকে বন্দরে ব্রিগেডিয়ার আনসারির কাছে পাঠিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গিয়েছিলেন। বাসার বাঙালি গার্ডদের সরানোর কথা তাঁর মনে হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, টু আইসি গ্রেফতার হলে, এমনিতেই তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে। জিয়াকে দেখে কোন ভাবান্তর হলোনা গার্ডদের, বরং এই গভীর রাতে তাঁকে দেখে ভাবলেন, তিনি গার্ডদের ডিউটি চেক করতে এসেছেন। জিয়া সরাসরি চাপ দিলেন কলবেলে। জাঞ্জুয়া নিজেই দরজা খুলে, পাজামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় বেরিয়ে এলেন। জিয়াকে দেখে তিনি ভুত দেখার মতই চমকে উঠলেন, ‘বললেন উহা পার সব ঠিক ঠাক হায়?’ জিয়া তার উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘স্যার আপনার সাথে কথা আছে, বাইরে আসেন’।
অত্যন্ত ধূর্ত জাঞ্জুয়া বললেন, ‘ঠিক হ্যায়, আন্দার আওনা!, চায়ে পিও ফের বাত কারেঙ্গে’।
জিয়া বললেন, ‘এখানে নয়, লেটস গো টু দ্য লাইন আদার অফিসার্স আর আলসো ওয়েটিং’। কিছুক্ষণ ভাবলেন জাঞ্জুয়া, তারপর বললেন ‘ঠিক হ্যায়, চ্যলে’।
ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলেন জিয়া, জাঞ্জুয়া বসলেন তাঁর পাশে। ড্রাইভারসহ জাঞ্জুয়ার বাসার দু’জন সৈনিক উঠলো পেছনে।একটুপর গাড়ি থামলো কোয়ার্টার গার্ডের সামনে। সেখানে ক্যাপ্টেন খালেক, লান্স নায়েক, শফি আর সেপাই রবিউল আনাম অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।গাড়ি থেকে নেমে রবিউলের রাইফেল, ছিনিয়ে নিয়ে জাঞ্জুয়া কিছু বোঝার আগে তার বুকে তাঁক করলেন, জিয়া, বললেন,
‘স্যার, ইউ আর আন্ডার এরেস্ট, ডোন্ট ট্রাই টু রিগেইন দ্য কমান্ড’।
একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন জাঞ্জুয়া।
জিয়া খালেককে বললেন, ‘টেইক হিম টু দ্য কোয়ার্টার গার্ড’।
জাঞ্জুয়া স্বপ্নেও এই পরিণতির কথা ভাবেননি। কোয়ার্টার গার্ডে গিয়ে তিনি একেবারে মুসড়ে পড়লেন। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, ‘মাই ফ্যামিলি স্যুড নো হোয়্যার আই এম’।
খালেক বললেন, ‘স্যার, কোন চিন্তা করবেনা, ভাবীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
মেজর জিয়ার হাতে তখন নষ্ট করার মত সময় নেই। তিনি দ্রুত দো’তলায় উঠে রাজনীতিবিদদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেন।ডিসি এসপিকেও বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করলেন। ক্যাপ্টেন, অলি বললেন, ‘স্যার আমরা যেহেতু বিদ্রোহ শুরু করেছি, ট্রুপ্সদের বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বাইরে রাখা ঠিক হবে না’। তিনি ক্যাপ্টেন সাদেক, লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিন, আর মাহফুজকে খবর পাঠালেন বায়েজিদ বোস্তামি থেকে চলে আসতে।
এইটথ, বেঙ্গলের মেসের দক্ষিণে ইপিআর মেসে দু’জন পাকিস্তানি অফিসার থাকতেন, খালেকুজ্জামান, তার ব্যাটম্যান সেপাই নুরুলকে পাঠালেন তাদের ডেকে আনতে। নুরুলকে দেখেই ক্যাপ্টেন নজর নামে তাদের একজন, রাইফেল তুলে হুমকি দিলেন। অফিসারদের রুমে রাইফেল থাকার কথা না। ভয় ও বিষ্ময় নুরুলকে যুগপৎ ভাবে নার্ভাস করে ফেললো। তিনি সরাসরি গুলি করলেন নজরকে। অন্য জনকে গ্রেফতার করা হলো। নজরের মৃত্যুর সংবাদে মন খারাপ হলো খালেকের কিছুদিন আগেই তারা এক সঙ্গে ক্যাপ্টেন থেকে মেজর হয়ার পরীক্ষা দিয়েছেন। নজর ছিলেন তাঁর স্টাডি পার্টনার।
যুদ্ধ কত কিছু বদলে দেয়!
জাঞ্জুয়াকে আনার সময় মেজর জিয়া মেসে গিয়ে, মীর শওকতকে জাগিয়ে এসেছিলেন। তিনি ইউনিটে এলেন একটুপর।জিয়ার সাথে তাঁর দেখা হলো কোয়ার্টার গার্ডের সামনে। জিয়া বললেন, ‘তুমি কী আমাদের সাথে আছো?’ এক মুহুর্তও চিন্তা করলেন না শওকত, বললেন, ‘অবকোর্স, হোয়াই নট?
জিয়া এসময় জাঞ্জুয়াকে অধিনায়কের অফিসে নিয়ে গেলেন। কমান্ডিং অফিসারের চেয়ারেই তাঁকে বসতে দেওয়া হলো।অন্য অফিসাররা রয়ে গেলেন কোয়ার্টার গার্ডের সামনে। অলি আহমেদ তখন জিয়ার হয়ে নেতাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
একটু পর শওকত উপরে গেলেন। জিয়া নেমে এসে আবার রাইফেল হাতে নিলেন, বললেন, ‘খুব সতর্ক থাকো সবাই, কেউ চালাকি করলেই গুলি’। খালিকুজ্জামান তখন নেভির গাড়ির ড্রাইভার আর বন্দী একজন নেভী সৈনিকের দিকে আগাচ্ছিলেন, রাইফেল নিয়ে ভয় দেখাতে, তাঁরা দু’জনই কেঁদে ফেললো, স্যার আমরা, বাঙালি স্যার, আমার বাড়ি পটুয়াখালি, আর হ্যার বাড়ি যশোর’। হেসে ফেললো, অন্য সবাই। এরকম সিরিয়াস অবস্থার সাথে সেটা মানানসই নয়। জিয়া তখন ব্যাটালিয়নের নতুন সিও। তাঁর দিকে চোখ পড়তেই, হাসি বন্ধ হয়ে গেলো সবার।
সুবেদার মেজর মোহাম্মাদ আলী ইউনিটের বয়োজ্যেষ্ঠ সৈনিক, তবে তাঁর চলা ফেরা দেখে সে সব বোঝা যাচ্ছিলোনা। তিনি সকল সৈনিককে জড়ো করে ফেললেন কোয়ার্টার গার্ডের সামনে, তারপর শওকতকে বললেন, ‘স্যার নতুন সিও সাবরে কিছু বলতে বলেন’।
শওকতসহ ইউনিটের সবাই তখন কেমন ঘোরের মধ্যে। শওকতের মন খারাপ হয়ে গেলো, তার কোম্পানিটা পোর্ট থেকে ফেরত আসতে পারেনি।তিনি বললেন, ‘এখন টু আইসি সাহেব আপনাদের সাথে কথা বলবেন, কোন দরবার নয়, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলবেন’।

নতুন অধিনায়কের কথা শোনার জন্যে সৈনিকরা উদগ্রীব। নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জয়ের পর থেকেই তারা বাঙালি সরকারের অপেক্ষায় ছিলো।এতদিন বিভিন্ন ভাবে নিজেরা নিজেরা মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলো।সরাসরি অফিসারদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব তাদের কাছে স্বপ্নের মত লাগছিলো। তাঁদের আবেগে জিয়াও আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। তিনি সকলকে শপথ করালেন,বললেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে যুদ্ধের মধ্যে আমাদের ঠেলে দিয়েছে, দেশ স্বাধীন করে তাঁর দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে হবে।হয় মারবো নয় বীরের মত মরবো তোমরা রাজী?

সকলে সমস্বরেঃ জবাব দিলো ‘জয় বাংলা’। মধ্য রাতের নিরবতা বিদির্ণ করে সেই ধ্বনি নাসিরাবাদ এবং আশে পাশের ভীতবিহবল, এবং আক্রান্ত বাঙালিদের মনে সাহস ছড়িয়ে দিতে লাগলো।

সূত্রঃ
সামরিক জীবনের স্মৃতি,
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর বানিজ্য নয়,
A Tale of Millions
Flames of Freedom
Bangladesh At War,
বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধযাত্রা ১৯৭১
মেজর সাইদুল ইসলাম (অব:)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here