বাংলাদেশ যার স্মৃতির মিনার

0
651

জিয়া। কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় আপ্লুত মাত্র দুঅক্ষরের এক দ্যুতিময় নাম। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গাঙ্গেয়বদ্বীপে কর্মচঞ্চল জনস্রোতে মিশে জনপদ থেকে জনপদে ক্ষিপ্রগতি চারণের বেশে ছুটে চলা সেই কর্মী রাষ্ট্রনায়কের ছবি বাংলাদেশের স্মৃতিপটে হয়ে আছে অক্ষয়। বিদ্বেষের বিষবাস্প ছড়িয়ে তাঁর স্মৃতিকে মলিন করার যত চেষ্টা প্রতিপক্ষ করেছে তত বেশি উজ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর হিরন্ময় নাম।
তাঁকে চেনবার জন্য কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই।

কোন খেতাব কিংবা ভূষণ যুক্ত করা আবশ্যকীয় নয় তাঁর পরিচিতির জন্য।

তাঁর নামে আলাদা করে কোন স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা স্থাপনা গড়বার দরকার নেই।

নিযুত দেশপ্রেমিকের পূত শোণিত ধারায় স্নাত হয়ে উত্থিত এই বাংলাদেশটাই তাঁর স্মৃতির মিনার।

নদীমেঘলা শস্যশ্যামলা এই বাংলাদেশকে তিনি ধ্যানে-জ্ঞানে তাঁর প্রথম ও শেষ তীর্থভূমি বলে নির্ধারণ করেছিলেন। জীবনে এবং মরণেও বাংলাদেশকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে। এই মৃত্তিকা পবিত্রতর হয়েছে তাঁরই শহীদী রক্তে। অবিনাশী আপন কীর্তিরাজি পশ্চাতে ফেলে তাঁর জীবনের রথ দিগন্তে পৌঁছে গেলে এখানেই রচিত হয়েছে তাঁর অন্তিম শয়ান। সামান্য সমাধিতলে নশ্বর দেহ রেখে সেই অসামান্য মহাপ্রাণ জাতিকে এখনো দেন পথের নির্দেশ।

বিস্ময়কর ঐন্দ্রজালীক এক সহজাত ক্ষমতা নিয়ে ক্ষণজন্মা জিয়া জাতির প্রয়োজনের মুহুর্তে বারবার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন। জীবন বাজি রেখে ইতিহাস নির্ধারিত দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করে; আবার তিনি নিজেই সরে গেছেন যবনিকার অন্তরালে। উনিশ’শ পঁয়ষট্টি সাল।

নব্য প্রসারণবাদী ভারত আধিপত্যের নগ্ন থাবায় গ্রাস করতে চাইলো ক্ষুদ্রতর নবীন প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে। প্রবল পরাক্রান্তের আগ্রাসনে বিপন্ন পাকিস্তান আত্মরক্ষায় প্রাণান্ত পরিরোধের লড়াই শুরু করলো। কিন্তু এই অসম যুদ্ধের পরিণাম ও পরিণতি অপরিজ্ঞাত ছিল না কারোই। অথচ অকল্পনীয়ভাবে ঘুরে গেল যুদ্ধের ফল। খেমকারানের রণাঙ্গন শত্রুপক্ষের জন্য ডেকে আনলো শোচনীয় বিপর্যয়। এক বঙ্গশার্দুলের অধিনায়কত্বে সেখানে দেশরক্ষার বীর সৈনিকেরা ভারতীয় হানাদারদের কেবল রুখে দিয়েই ক্ষ্যান্ত হলো না, যুদ্ধকে তারা প্রতিপক্ষের মাটিতে ঠেলে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো। ভিনদেশ দখলের উদগ্র লালসার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে ভারতীয় ভূখন্ডে তারা উড্ডীন করলো পাকিস্তানের কওমি নিশান। বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদসমেত একদল ভারতীয় সৈন্য বন্দী হলো সেই ঐতিহাসিক রণাঙ্গণে। খেমকারানের যুদ্ধের বিজয় গাথার সাথে বিদ্যুৎগতিতে সবখানে ছড়িয়ে পড়লো একটি নাম ‘জিয়া’। বিস্ময়কর বিজয়ের সাহসী অধিনায়ক।

ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৫ সালের প্রতিরোধ যুদ্ধের সাফল্য পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের সমরবিদদের ব্যক্তিগত বীরত্বের অহংকার চুরমার করে দিয়েছিল। এরা দীর্ঘকাল ধরে প্রচার করতো যে, পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনসাধারণ ভীরু ও কাপুরুষ। তারা ‘মার্শাল রেস’ নয় এবং দৈহিক গড়নের কারণেও সৈনিক হবার অনুপযুক্ত। কাজেই পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চ পদগুলো পাঞ্জাবিদের জন্যই কেবল সংরক্ষিত থাকা উচিত। জাত-বিদ্বেষী ওই পাঞ্জাবি জেনারেলরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল খেমকারান রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানের অভূতপূর্ব বীরত্বপূর্ণ বিজয়ে।

কিন্তু খেমকারান রণাঙ্গনে বিজয়ের কিংবদন্তী রচনা সত্ত্বেও নিজের কৃতিত্ব জাহিরে ব্রতী হননি জিয়া। দেশের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধকে তিনি সৈনিকের ওপর অর্পিত সুমহান কর্তব্য বলেই বিবেচনা করেছেন। সুশৃঙ্খল সৈনিক হিসেবে নিজেকে সমর্পিত রাখেন সমারিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের আওতায়।

এরপর ১৯৭১। জাতীয় ইতিহাসের চরম দুর্যোগময় কাল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে পাকিস্তানি সমরজান্তার অভিমৃষ্যকর টালবাহানায় দেখা দেয় গুরতর সংকট। সমঝোতার সকল প্রচেষ্টা পর্যবসিত হয় চরম ব্যর্থতায়। গণহত্যা, রক্তপাত আর বর্বরতার আশ্রয় নিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার আর ভোটের রায়কে বানাচাল করার উদ্দেশ্যে শুরু হয় নৃশংস আক্রমণ। আচানক সেই মরণযজ্ঞে দিশেহারা হয়ে পড়েন এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। প্রতারণাপূর্ণ বৈঠকের হায় কালক্ষেপনের আড়ালে হত্যাযজ্ঞের যে নির্ভত ভয়ঙ্কর প্রস্তুতি ইতোপুর্বে শুরু হয়েছিল, অদূরদর্শী নেতাদের কারো কারো কাছে তই ছিল অভাবিত। তাদেরই কেউ কেউ আবার ক্ষমতার উদগ্র মোহে আপসের চোরাবালিতে পা রাখার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির অলীক আশায় বিভোর হয়ে জনবিক্ষোভ দমনে সীমিত লক্ষ্যস্থলে সামরিক অভিযানের গুপ্ত পরিকল্পনায় সঙ্গোপনে অনুমোদনও দিয়ে রেখেছিলেন। এই নেতারা সকলেই ২৫ মার্চ মধ্যরাতের ইতিহাসের পৈশাচিক গণহত্যার ভয়াবহতায় হয়ে পড়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আক্রান্ত অসহায় দেশবাসীকে ফেলে এদের অনেকে পালিয়ে গিয়ে এবং কেউ কেউ আত্মসমর্পনের মাধ্যমে বেছে নিয়েছিলেন আত্মরক্ষার পথ। সেই সময় আবারো ইথার কম্পনে ভেসে এলো সেই নাম। কালুরঘাটের বেতার তরঙ্গ মারফত ছড়িয়ে পড়লো সেই বরাভয়: ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’।

১৯৬৫ সালের খেমকারান রণাঙ্গনের বিজয়ী দুঃসাহসী বরি রঙ্গশার্দুল জিয়া ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দুর্জয় ভূখন্ডে পাকিস্তানি শাসন কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তারও আগে সময়ের ডাক শুনে মাতৃভূমির প্রতি নিখাদ ভালোবাসার তাড়নায় তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন সামরিক শৃঙ্খলার বেড়াজাল ভেঙে। কেউ তাঁকে তাড়িত, প্ররোচিত কিংবা উজ্জীবিত করতে হয়নি। অন্তর্গত তাগিদ থেকে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদ্রোহ করে জয় চিনিয়ে আনার যুদ্ধ শুরুর। দেশ যখন আক্রান্ত, দেশবাসী বিপন্ন সেই ঘোর দু:সময়ে দেশরক্ষার সৈনিককে কোন পিছুটান ফিরিয়ে রাখতে পারেনি সুকঠিন কর্তব্য পালন থেকে। প্রিয়তম স্ত্রীর সকাতর চাহনি, প্রাণপ্রতিম সন্তানদের মায়াডোর উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখে নিজের নামে আবার রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে স্বাধীনতার এই আহ্বানের সর্বজনীন রূপ দেয়ার লক্ষ্যে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নামটিও এর সাথে জুড়ে দিতে তিনি কুণ্ঠিত হননি।

কিন্তু কেবল বেতার সম্প্রচার কেন্দ্রের ঘোষণার মধ্যেই জিয়া তাঁর কর্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্বাধীনতার ঘোষণাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য স্বাধীনতাকামী সৈনিক জনতাকে সংগঠিত করে বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের লড়ইকে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত করেন। জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর তাগিদে স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়কত্ব এবং তাঁর স্বকণ্ঠে ঘোষিত অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের পদও তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুকূলে ত্যাগ করে রণাঙ্গনের একজন সুশৃঙ্খল অধিনায়ক হয়ে যান যুদ্ধের সূচনালগ্নেই। যুদ্ধ জয়ের মধ্যদিয়ে উদ্ভাবিত নবীন রাষ্ট বাংলাদেশেও তিনি নতুন রাজনৈতিক কতৃত্ব ও সামরিক নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য পোষণ করে মনোনিবেশ করেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালনে। যদিও জাতীয় মহাদুর্যোগের মুহুর্তে অপরিসীম ত্যাগ, অপরিমেয় সাহস ও অনন্য সাধারণ দূরদর্শিতায় তিনি সময়োচিত ও অতুলনীয় বলত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে যে যুগান্তকর অবদান রেখেছিলেন তার পরিমাপ ও উপযুক্ত মূল্যায়নের যোগ্যতা ও মানষিকতা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নব্য রাজপুরুষরা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন, দিগন্ত বিস্তৃত প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছত্রখান হয়ে গিয়েছিল দুর্বিনীত স্বদেশী নব্য-শাসকদের মদমত্ততায়। শতাব্দীর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ হয়েছিল বিপন্ন। নিষ্ঠুর লুণ্ঠনে জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের বাঁধাবুলি জনগণের কাছে হয়ে উঠেছিল এক নির্মম প্রহসন। অবাধ হত্যাকান্ডের লীলাভূমিতে পরিণত বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিতি অর্জন করেছিল বিভীষিকাময় এক মৃত্যু উপত্যকার। সেই ব্যর্থও নিষ্ঠুর শাসনের সর্বশেষ পরিণতিতে গণতন্ত্রের শেষ নিশানাটুকুও মুছে ফেলে মধ্যযুগীয় নৃপতি ধাঁচের একদলীয় ও ব্যক্তিনির্ভর ডাইনেষ্টি শাসনপ্রথা প্রবর্তন করা হয়। শান্তিপূর্ণ পন্থায় শাসক দল ও সরকার বদলের সকল পথ করে দেয়া হয় রুদ্ধ। দেশরক্ষা বাহিনীকে চরম উপেক্ষা ও অবজ্ঞার শিকারে পরিণত করে সমান্তরাল বিভিন্ন খুনী ঠ্যাঙারে বাহিনী গড়ে তোলা হয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। কিন্তু এতোকিছু সত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন ও সূচনাকারী সমরনায়ক জিয়াউর রহমান কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় আনুগত্যে অটল থেকেছেন। সংবিধানসম্মত ও বৈধ অসামরিক রাজনৈতিক শাসন কর্তৃত্বের ওপর আস্থা রেখে তিনি একজন সুশৃঙ্খল সৈনিক হিসেবে অর্পিত কর্তব্য নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ, দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের একটি অংশ, এমনকি শাসক মহলের গণতন্ত্রকামী একটি গোষ্ঠীও বিরাজমান নৈরাজ্য, স্বেচ্ছাচার ও ধ্বংশলীলা মেনে নিতে পারেনি। তাদেরই পরিকল্পনায় গণআকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে ১৯৭৫ এর মধ্য আগস্টে রক্তক্ষয়ী এক সশস্ত্র সেনাঅভ্যুত্থানে ঘটে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার পটবদল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চাপা উল্লাসে ওই পরিবর্তনের প্রতিমৌন সমম্মতি প্রদান সত্ত্বেও উক্ত ঘটনার মধ্যদিয়ে দেশে স্থায়ী স্থিতি আসেনি। খন্দকার মোশতাক আহমদ নামের একজন প্রবীণ আওয়ামী রাজনীতিক দেশজুড়ে সামরিক শাসন বলবৎ ও শাসনতন্ত্র স্থগিত করে রেখে তাঁর নিজস্ব মর্জি ও বিবেচনা মাফিক শাসন চালাতে থাকেন। অসামরিক ব্যক্তির নির্দেশিত সেই সামরিক প্রশাসনের ঘোষিত কোন স্বচ্ছ দিকনির্দেশনা ছিল না। দেশে রাজনৈতিক দলের কোন অস্তিত্ব ছিল না। রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ। জাতির বর্তমান ছিল বিভ্রান্ত, ভবিষ্যৎ ছিল অন্ধকার।

রাজনীতিহীন ওই সময়ে বিভিন্ন মতাসুসারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য দেশে সশস্ত্র বাহিনীকেই একমাত্র উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এতে জাতীর ঐক্য ও আশা-আকঙ্খার প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীতে সৃষ্টি হচ্ছিল না দল-উপদল, ভেঙ্গে পড়ছিল শৃঙ্খলা ও সংহতি। সেই চরম অনিশ্চিত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে দেশী-বিদেশী চক্রান্তের ক্রীড়নক হয়ে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে ৩ নভেম্বর ঘটিয়ে দেয় এক স্বল্পমেয়াদী ক্যুদেতা। স্বাধীনাতার ঘোষক, তদানীন্তন সেনাপ্রধান জিয়া তাদের হাতে বন্দী হন। তবে উচ্চাভিলাষী কতিপয় সেনা কর্মকর্তার এই ক্ষমতা দখলের অভিযান শেষ অব্দি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই সারাদেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়। সাধারণ সৈনিকেরা অস্ত্র হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে আসে ব্যারাক থেকে। বন্দী সেনাপ্রধান জিয়াকে মুক্ত করে কাঁধে তুলে তারা নেমে আসে রাজপথে। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, কুচক্রীরা নিপাত যাক, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে সৈনিকরা ৭ নভেম্বর সুবেহ সাদেকের সময় রাস্তায় নামলে তাদের প্রতি স্বত:স্ফুর্ত সমর্থন জানাতে সারাদেশের সাধারণ মানুষও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ বনিতা দেশরক্ষার সৈনিকদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে শ্লোগান তোলে। সেনাদলগুলোকে বিপুল করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করতে থাকে রাজপথের দু’পাশে অপেক্ষমান লাখো জনতা। জনসমুদ্র থেকে বর্ষিত পুষ্পবৃষ্টিতে ছেয়ে যায় ট্যাংক, সাঁজেয়া যান। কামানের নলে মালা পরায় সাধারণ মানুষ। সে এক অভূতপূর্ভ দৃশ্য! ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পর আর কখনো এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়নি।

ক্যুদেতা ঘটিয়ে উচ্চাভিলাষী সামরিক অফিসারদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চক্রান্ত্রের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বরের সৈনিক-জনতার জাগৃতি ছিল এক প্রবল প্রতিরোধের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এই বিপ্লবী অভ্যুত্থানের নায়ক কোন জাঁদরেল সেনাপতি নন, সাধারণ সিপাহীরা। আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনতা। তারাই সেদিন বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে এনে এক অরাজক ও নেতৃত্ব শূণ্য পরিস্থিতিতে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল দেশ পরিচলনার দায়িত্ব। প্রকাশ্য রাজপথে লাখো সৈনিক-জনতার পুষ্পবর্ষণে অভিষেক ঘটে তাঁর রাষ্ট্রক্ষমতার।

৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে রাজনীতি, গঠিত হয় রাজনৈতিক দল, পুন:প্রতিষ্ঠিত হয় জনগণের নির্বাসিত মৌলিক অধিকার, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা। এই বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে চক্রান্ত মুক্ত হয়ে সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আধিপত্যবাদী শক্তি স্বার্থের পরিপূরক অবস্থান থেকে বাংলাদেশের নামের জাতিরাষ্ট্র বা নেশনস্টেটটির নাগরিকরা রাষ্ট্রভিত্তিক, আধুনিক ও বাস্তবসম্মত এক জাতীয় পরিচয় অর্জন করে। আর আত্মপরিচয় লাভের মাধ্যমে নবোদ্দীপ্ত এবং আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নোত্থিত এই বাংলাদেশী জাতিসত্তাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, স্বকীয়তা, মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি, স্বাধীন অর্থনীতি ও গৌরব নিয়ে সমুখ পানে এগিয়ে চলার প্রশস্ত নতুন মহাসড়ক গড়ে দেন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে বদলে ফেলেছিলেন জিয়াউর রহমান। পশ্চাদমুখী ও সঙ্কীর্ণ সামন্তচিন্তার অর্গল ভেঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে স্থাপন করেছেন সম্মুখ প্রসারী, উদার ও আধুনিক ধারায়। আজ এ দেশের যেখানেই উৎপাদন, উন্নয়ন ও নির্মাণের স্বাক্ষর রয়েছে, সেখানেই মিলবে তাঁর গণমুখী ও কল্যাণকর পরিকল্পনার ছোঁয়া। কেবল তাঁর সমকালেই নয়, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শন কালোত্তীর্ণ হয়ে আজ এ দেশের জাতীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ইতিহাস নির্ধারিত যুগান্তকারী দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আবার ফিরে গেছেন যাবনিকার অন্তরালে। তবে তাঁর এবারকার যাত্রা অন্তিম এবং আর কখানো তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। কেবল তাঁর কালজয়ী আদর্শ এ জাতিকে পথ দেখাবে। আর এই বাংলাদেশ হয়ে থাকবে তাঁর স্মৃতস্তম্ভ।

লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট; মাননীয় বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস সচিব
.Maruf Kamal Khan

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here