বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট: সুফল পাচ্ছে কে?

0
201

নয় বছর আগে নয়া দিল্লিকে সুবিধা দিতে ঢাকার সম্মতি প্রকাশের জের ধরে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সাথে অবশিষ্ট এলাকাকে সংযুক্ত করতে কৌশলগতভাবে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন আঞ্চলিক কানেকটিভিটি থেকে যতটা সম্ভব ফায়দা হাসিল করার জন্য চেষ্টা করা উচিত বাংলাদেশের।

দীর্ঘ ঘুরপথ এড়ানো এবং অর্থ ও সময় বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ পরিচালনা করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে চলেছে ভারত। দুই দেশের কর্মকর্তারা আগামী মাসে শুরুতে কোন কোন রুট ব্যবহৃত হবে এবং ট্রানজিট ফি হিসেবে বাংলাদেশকে কত পরিশোধ করবে, তা নির্ধারণ করতে বসবেন।

সম্প্রতি ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দুটি নয়া দিল্লিকে ব্যবহার করতে দিতে সম্মত হয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশের নদী, রেললাইন ও রাস্তা ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করতে পারবে ভারত।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, উন্নত কানেকটিভিটি বাংলাদেশকেও সহায়তা করবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত বাংলাদেশ আঞ্চলিক হাব ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে।

নৌ-প্রটোকল

বাংলাদেশ ও ভারত ২০১০ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো ট্রানজিট চুক্তিতে সই করে।

এরপর ২০১৫ সালে দুই সরকার বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে চারটি নদীপথ ভারতকে ব্যবহার করতে দিতে সম্মত হয়। এর ফলে কোলকাতা ও মুর্শিদাবাদ সংযুক্ত হয় আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সাথে।

কলকাতা-আশুগঞ্জ-আখাউড়া নদীপথটি ২০১৬ সালের জুনে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে মাত্র ১৩টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। তারা ট্রানজিট ফি হিসেবে বাংলাদেশকে দিয়েছে ২৮ লাখ টাকা।

জাহাজ চলাচল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিয়মিতভাবে এই রুট ব্যবহার করে না। কারণ নদীপথ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা ও বন্দরগুলো এখনো প্রস্তুত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩-৬ অক্টোবর দিল্লি সফরের সময় দুই দেশ মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ন থেকে রাজশাহী হয়ে ত্রিপুরার সোনামুরা যেতে নদীপথ ব্যবহারে সম্মত হয়।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, এটি ও অন্যান্য নদী রুট শিগগিরই সক্রিয় হবে।

বন্দর ব্যবহার

দুই দেশ ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দুটি ব্যবহার করতে দিতে সমঝোতা স্মারকে সই করে। ভারত অনেক দিন থেকেই এই দাবি জানিয়ে আসছিল। সমঝোতা স্মারক সই করার পর শেখ হাসিনার অক্টোবরে ভারত সফরের সময় একটি চুক্তি সই হয়।

এই চুক্তি অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে মালামাল অবতরণের পর তা সড়ক, রেল ও নৌপথে আখাউড়া হয়ে আগরতলা (ত্রিপুরা), তামাবিল হয়ে ডাউকি (মেঘালয়), শেওলা হয়ে সুতারকান্দি (আসাম) ও বিবিরবাজার হয়ে শ্রীমান্তপুর (ত্রিপুরা) যাবে।

এর ফলে ভূবেষ্ঠিত আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে সাগরে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

২০১৫ সালের নদী প্রটোকলের আওতায় জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ দুই হাজার টন মালামাল বহনের অনুমতি দেয়া হয়। তবে বড় জাহাজ নৌপথ ব্যবহার করতে পারবে না।

ফেনি সেতুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরটি ত্রিপুরার সাথে সংযুক্ত। ভারত তার এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করছে।

ঋণের আওতায় অবকাঠামো নির্মাণ

ভারত এখন পর্যন্ত ৭.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের তিনটি লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) দিয়েছে বাংলাদেশকে। এই অর্থের বেশিরভাগই বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কানেকটিভিটির অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বন্দরে একটি বে কন্টেইনার টার্মিনাল, মোংলা বন্দরের আরো উন্নয়ন, রামগড়-বরুয়ারহাট চার লেনের মহাসড়ক, কুমিল্লা-বাহ্মণবাড়িয়া-সরাইল মহাসড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।

ঢাকা কি উপকৃত হবে?

বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলাচলকারী ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে পারে বাংলাদেশ। তাছাড়া রফতানিও বাড়াতে পারে বাংলাদেশ।

নদী প্রটোকল অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি টন পণ্যের জন্য ২৭৭ টাকা আদায় করতে পারে। এর মধ্যে ৫০ টাকা নিরাপত্তা বাবদ এবং ৩৪ টাকা যাবে জেটিতে নোঙর করা বাবদ।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি টনের জন্য ১,০৫৮ টাকা ধার্য করার যে প্রস্তাব তৈরি করেছিল, তা বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। পরে উভয় দেশের কর্মকর্তারা তা ২৭৭ টাকা নির্ধারণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, আমরা যদি ইকোনমিক জোনগুলোতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারি, তবে অন্যান্য দেশ আমাদের রাস্তা, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যবহার করে তাদের রফতানি বাড়াবে, আর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

তিনি বলেন, ইকোনমিক জোনগুলো রাস্তা, রেল ও নৌপথের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে হবে।

কিছু তথ্য বা মতামত,  ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশীর সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ককে স্মরণকালের মধ্যে সেরা বলে অনেকেই অভিহিত করে থাকেন। তবে এই সুসম্পর্কে ন্যায্যতার ঘাটতি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই। তিস্তার পানি নিয়ে দুই দেশের সরকার চুক্তির খসড়া তৈরির পরও আট বছরে তা সই হয়নি ভারতীয় এক রাজ্যের আপত্তির অজুহাতে। পেঁয়াজের মতো সামান্য একটি পণ্য রপ্তানির রাজনৈতিক গুরুত্ব বিচারে বাংলাদেশের চেয়েও মালদ্বীপের বেশি অগ্রাধিকার পাওয়া কম তাৎপর্য বহন করে না। তবুও আওয়ামীলীগ সরকার ভারতের অন্ধ ভক্ত।

সব মিলিয়ে ভারত এ পর্যন্ত ৭৮৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই করলেও গত ৯ বছরে দিয়েছে মাত্র ৫৯ কোটি ডলার, শতকরা হিসাবে যা সাড়ে ৭ শতাংশের মতো। (৯ বছরে ভারতের অর্থায়ন সাড়ে ৭ শতাংশ, ১৯ নভেম্বর ২০১৯)। তাহলে বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত শুধু ঋণের অঙ্গীকারের মাত্র ৭ শতাংশ অর্থায়ন করে তার প্রত্যাশিত সংযুক্তি প্রকল্পগুলোর ৮০ শতাংশ সুফল ভোগ করছে। বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ন্যায্যতা কিংবা ভারসাম্যের এক বিরল সংযোজন বললে কি ভুল হবে? ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নদীর পানির হিস্যা প্রশ্নে এই ধারণা প্রবল হয়েছে যে আমরা অন্যায়ের শিকার এবং লাভ-ক্ষতির নিক্তিতে আমাদের প্রতিবেশী একতরফা সুবিধাভোগী। সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকদের সন্দেহের বশে হত্যা বন্ধ না হওয়ার ক্ষোভ, রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের প্রতি পক্ষপাত এবং কথিত অবৈধ বাংলাদেশি বিতাড়নের অভিযানের মতো বিষয়গুলোও এই ধারণাকে জোরদার করেছে। কংগ্রেস নেতা ও সাবেক কনিষ্ঠ মন্ত্রী শশী থারুর সম্প্রতি ঢাকায় প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন, ‘উপমহাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা যা নেব, তার থেকে প্রতিবেশীদের আমাদের অবশ্যই বেশি দেওয়া উচিত।’ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকার সময়ে তাঁরা এ রকম সদিচ্ছার কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। আর বর্তমান বিজেপি সরকারের কাছে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়েও বড় বিষয় যে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। এই রাজনীতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করার ঝুঁকির চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা। প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম ভারসাম্যহীন সম্পর্ক কত দিন বজায় থাকবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here