নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দেশ!!

0
90

বিশ্বব্যাপী অদৃশ্য এক শত্রুর সঙ্গে চলমান লড়াইয়ে বৃহস্পতিবার থেকে একাট্টা বাংলাদেশ। অঘোষিত লকডাউন চলছে দেশজুড়ে। চলবে আগামী ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময়ে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের তরফে। মানুষের ঘরে থাকা নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দোকানপাট-বিপণি বিতান, গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে।

কেবল জরুরি সেবাসমূহ এই বিধি-নিষেধের বাইরে।বিদেশ ফেরতদের ঘরে থাকা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দেশজুড়ে কাজ শুরু করেছেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এলাকায় এলাকায় চলছে সচেতনতামূলক প্রচারণা। কভিড-১৯ নামের অদৃশ্য ঘাতকের ভয় আর আতঙ্কে গুটিয়ে গেছে জনজীবন। রাজধানী থেকে গ্রামের মেঠোপথ সর্বত্র জনশূন্য অবস্থা। সরকারের নির্দেশনা মেনে পারতপক্ষে ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউ। জরুরি প্রয়োজনে যারা বের হচ্ছে তারাও আবার ঘরে ফিরে যাচ্ছেন দ্রুততম সময়ে।

গতকাল সকাল থেকে ভিন্ন এক চিত্র রাজধানীতে। বুধবার রাত থেকে অনেকটা আঁচ করা যাচ্ছিলো যে অঘোষিত লকডাউনে যাচ্ছে ব্যস্ত এই নগরী। বিকাল থেকে ছিল মানুষের ঘরে ফেরার তাড়া। সকালে যারা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হন তাদের চোখে নতুন এক দৃশ্য ধরা দেয়। ঈদ বা সাধারণ ছুটিতেও এমন ফাঁকা দেখা যায় না নগরীর সড়ক। অনেকটা জনশূন্য। যানবাহন নেই। হাতে গোনা দুই একটা রিকশা এদিক সেদিক যাচ্ছে। চালকদের সতর্ক দৃষ্টি। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন সদস্যকে দেখামাত্র নিজেদের আড়াল করে নিচ্ছেন। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষদের ত্রাতা এই রিকশাচালকরা পৌঁছে দিচ্ছেন গন্তব্যে। তবে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। বাড়তি ভাড়া নিলেও যাত্রী না থাকায় ঘর থেকে বের হওয়া এই রিকশা চালকদেরও ঝিমুতে দেখা যায় সড়কের মোড়ে মোড়ে। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর এমন ফাঁকা চিত্র শেষ কবে দেখা গেছে তা অনেকের জানা নেই। দুই পাশের সব দোকান বন্ধ। মাঝে মাঝে নিত্যপণ্যের দোকান বা ফার্মেসি খোলা থাকলেও মানুষজন নেই। মাঝে মাঝে পুলিশ, সেনা বাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গাড়ির টহল দেখা যায় কোথাও কোথাও। এছাড়া এম্বুলেন্স ও পন্যবাহী দুই একটি পিকাপ ছাড়া সড়কে আর কোন যানবাহন দেখা যায়নি দু’একটা।

হরতাল বা অবরোধের মতো পরিস্থিতিতে সড়কে গণমাধ্যমের অনেক গাড়ি দেখা গেলেও করোনা মোকাবিলার এ ‘যুদ্ধ’ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমেরও গাড়িও চোখে পড়েনি খুব একটা। যে কোন সঙ্কটে সব বন্ধ হয়ে গেলেও গণমাধ্যমের ওপর ভরসা রাখে মানুষ। খবর জানতে ছাপা পত্রিকা ও টেলিভিশনে চোখ রাখেন সবাই। এবারের এই করোনা ছাপা পত্রিকা হাতে নেতার মতো পাঠকও কমে গেছে। এ পর্যন্ত গবেষণা বলছে, ছাপা কাগছে করোনা ভাইরাস ছড়ায় না। তাই পত্রিকা হাতে নিলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নেই। দুপুরের পর মিরপুর ১২নম্বর থেকে প্রধান সড়কে কোন যানবাহন দেখা যায়নি। মোড়ে মোড়ে দু’একটি রিকশা দেখা গেলেও যাত্রী ছিল না। সিটি ক্লাবের ফটকে অপেক্ষমান রিকশা চালক ফরিদ বলেন, যাত্রী নেই বসে আছি। যদি পাই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৮০ টাকার ট্রিপ দিয়েছি। সারা দিনে আর কতো পাই জানি না। প্রধান সড়কের দুই পাশের আবাসিক এলাকা ঘুরেও দেখা গেছে একই চিত্র। বাড়িগুলোর প্রধান ফটক বন্ধ। সড়কে মানুষ বা যানবাহন নেই। বন্ধ দোকান-পাট। কাঁচা বাজারে দোকান খোলা থাকলেও মানুষ নেই। বেলা দুইটায় ১০ নম্বর গোল চত্ত্বর এলাকায় দেখা যায় চার দিকের রাস্তা ফাঁকা। ট্রাফিক বক্সে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ভিতরেই অবস্থান করছিলেন। সেনাবাহিনী ও র‌্যাবের কয়েকটি গাড়ি একটু পর পর টহল দিতে দেখা যায়। পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকজন রিকশা চালক।

তাদের একজন আবু তালেব। তিনি বলেন, এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি। কারফিউ দেখেছি। তখনও মানুষ পাড়া-গলিতে বের হয়। এখন পাড়ার গলিতেও দুই জন মানুষ দেখা যাচ্ছে না। ওই পয়েন্টে এসে যাত্রীর জন্য থাকেন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান এমন একজন চালক। তিনি বলেন, পেটের তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে বের হয়েছি। যদিও দুই একজন যাত্রী পাই। সকাল থেকে দুই দফা পুলিশের জেরায় পড়েছি। তিনি বলেন, যাত্রী নেই তাই আর কিছু সময় থেকে বাসায় ফিরে যাবো। একই চিত্র দেখা গেছে পুরো রোকেয়া সরণি, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়িসহ পুরো নগরজুড়ে। এদিকে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খাদ্যপণ্যবহনকারী যানবাহন চলতে দেয়া হচ্ছে। এসব যানবাহন পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটকাচ্ছে না। একই সঙ্গে ওষুদ, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি, রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়ি নিষেধাজ্ঞার বাইরে রয়েছে। এদিকে ঢাকার মতো পুরো দেশেই সড়কে একই চিত্র দেখা গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষজন ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বন্ধ আছে সব ধরণের যানবাহন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দিচ্ছে সড়কে। কেবলমাত্র জরুরি সেবা চালু আছে। মহাসড়কগুলোতে চলছে না যাত্রীবাহি কোন যান। শুধুমাত্র জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় জনসাধারণের যাতায়াত ঠেকাতে ফেরি চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি- বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়। বুধবার থেকেই বন্ধ করে দেয়া হয় লঞ্চ, ট্রেন, অভ্যন্তরীন রুটের বিমান চলাচল। বুধবার মধ্য রাত থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরণের গণপরিবহন। বুধবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছুটি থাকাকালে সবাইকে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করার আহবান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here