তাপস না খোকন, ভাগ্য নির্ধারণ হবে আজ দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক

0
41

শাওন মুন্সী:

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ততই বাড়ছে। ভোটের লড়াইয়ের আগে মনোনয়ন নিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আতিকুল ইসলাম আবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন তা মোটামুটি নিশ্চিত হলেও দক্ষিণে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস না বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রার্থী করা হবে তা নিশ্চিত হয়নি। আজ মনোনয়ন বোর্ড এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। অন্য দিকে দক্ষিণে ইশরাক হোসেন বিএনপির একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় তার ধানের শীষের টিকিট পাওয়া নিশ্চিত। আর উত্তরে দুজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় আজ মনোনয়ন বোর্ড এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তাছাড়া একই দিন বিকালে গুলশানস্থ বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে দলের মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

এদিকে, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের শেষদিনে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের জন্য মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা ১০ আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, দলের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী নজিবুলস্নাহ হিরু ও ঢাকা-৭ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ হাজী মো. সেলিম। এর মধ্যে ব্যারিস্টার তাপস ও কাজী নজিবুলস্নাহ হিরু ছাড়া বাকি সবাই নিজে উপস্থিত ছিলেন।

হাজী সেলিম কথা না বলতে পারার কারণে গণমাধ্যমের সঙ্গে তার পক্ষে কথা বলেন দেলোয়ার হোসেন। আর ফজলে নূর তাপসের পক্ষে কথা বলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোর্শেদ কামাল। তিনি বলেন, ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস তার নির্বাচনী এলাকাকে উন্নয়নের সূতিকাগারে পরিণত করেছেন। এ কারণে নগরবাসীও চাচ্ছেন শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র নির্বাচিত হোন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজী সেলিম ও ব্যারিস্টার তাপসের নেতাকর্মীদের মধ্যে পালটাপালটি স্স্নোগান হয়।

এর আগে মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমার নেত্রী আমার অভিভাবক শেখ হাসিনার প্রতি আমার আস্থা এবং বিশ্বাস আছে। আমার প্রিয় নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন। আমার বাবার অবর্তমানে আমার অভিভাবক প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার দলীয় মনোনয়ন ফরম তুলে তাকে (প্রধানমন্ত্রী) সালাম করতে গণভবনে গিয়েছিলাম। আমার পিতা বেঁচে নেই, পিতার হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছি। পিতার অবর্তমানে শেখ হাসিনাই আমার অভিভাবক। তিনি যেটা ভালো মনে করবেন তাই করবেন। তার সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব।’

প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছে কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনোনয়ন দেয়ার জন্য একটি প্রক্রিয়া আছে সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মনোনয়ন দেয়া হবে। স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ সভায় চূড়ান্ত হবে মনোনয়ন পাব কি না।

অন্য দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশায় ফরম জমা দিয়েছেন বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি বলেন, ‘মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রায় নয় মাস অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পারলে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ‘সবাইকে নিয়ে সবার ঢাকা’ গড়ে তুলতে পারব।’

২০১৯ সালে উপ নির্বাচনে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিদিন কাজ করেছেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিদিন কাজ করেছি। এমন একটা দিন নেই যেদিন নগরের কাজে, নগরবাসীর প্রয়োজনে আমি ছিলাম না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী দল। আমি শতভাগ আশাবাদী এই দলের হয়ে মনোনয়ন পাব।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৪ জন, আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬ জন। মোট ৮০৯ জন কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে আবেদন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে উত্তরে নিয়েছেন ৩৩৬ জন এবং দক্ষিণে ৪৭৩ জন।

বিএনপি

আসন্ন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির তিন নেতা। শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী তাবিথ আউয়াল এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী ইশরাক হোসেন একসঙ্গে আসেন। প্রথমে তাবিথ আউয়াল এবং পরে ইশরাক হোসেন দলীয় মনোনয়নপত্র বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের কাছে জমা দেন। এরপর ডিএনসিসিতে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন তার মনোনয়নপত্র জমা দেন।

তাবিথ এবং ইশরাক মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, এস এম জাহাঙ্গীরসহ বেশকিছু নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও রিপনের সঙ্গে হাতেগোনা ক’জনই ছিলেন।

মনোনয়ন পেলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর দুজনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ রকম প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রশ্ন ছিল- সরকারি দল থেকে বলা হচ্ছে যে, বিএনপি নির্বাচন বিতর্কিত করার জন্য অংশগ্রহণ করছে। শেষ পর্যন্ত আপনারা নির্বাচনের মাঠে থাকবেন না। আপনারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবেন কি না।

জবাবে ঢাকা উত্তরের মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘আমি প্রকাশ্যে বলতে চাচ্ছি- নির্বাচন আমাদের, জনমত আমাদের। নির্বাচন থেকে আমরা সরবই না। আমরা শেষ পর্যন্ত, শেষের পরের থেকেও লড়াই করে নির্বাচনের ফলাফলই ছিনিয়ে আনব না; দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি করার পরেই আমরা মাঠ থেকে ফেরত যাব।’

দক্ষিণের দলের একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘যদি কেউ বলে থাকে যে, নির্বাচনকে আমরা বিতর্কিত করার চেষ্টা করছি- এটা মোটেই ঠিক না। আমরা কেন, সারা দেশবাসী দেখেছে যে, ৩০ তারিখ বা ২৯ তারিখ কি ধরনের নির্বাচন বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়েছে। ওইটি কোনো নির্বাচন হয় নাই। তবে আমরা নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি বুঝে দলের যারা সিনিয়র নেতৃবৃন্দ আছেন তাদের সাথে পরামর্শ করেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব, যদি দল আমাদের মনোনয়ন দেয়।’

কর্মীদের উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ‘বারে বারে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এসেছে এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। আপনারা হতাশ হবেন না। ইনশালস্নাহ গণতন্ত্র ফিরে আসবে আমাদের মাঝে।’

সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে ‘সরে যাওয়া উচিত’ বলে মনে করেন উত্তরের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে নির্বাচনে যাওয়ার- এই নির্বাচনে যাওয়ার কোনো অর্থ নাই। কারণ হচ্ছে, আমাদের পার্টির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলে। উনাকে এখন পর্যন্ত আমরা মুক্ত করতে পারি নাই। শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলে ছিল তখন তাকে মুক্ত করেই গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়া হয়েছিল। আমরা জাতীয় নির্বাচনের সময় এ রকম অনেক কিছু বলতে পারতাম, করতে পারতাম কিন্তু আমাদের নেত্রীকে ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে গিয়েছি। কোনো লাভ হয় নাই, আমাদের দাবি পূরণ হয় নাই এবং নির্বাচন কী হয়েছে তা আপনারা সবাই জানেন। এই সরকার এবং এই দল যখন ক্ষমতায় থাকবে এবং এর অধীনে যখন নির্বাচন কমিশন থাকবে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব না। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মনোনয়ন পাওয়া- এর মধ্যে আমি কোনো ফারাক দেখি না। সেজন্য আমি মনে করি, আমাদের নেত্রীকে মুক্তি দিচ্ছে না, তার সুচিকিৎসা হচ্ছে না; তার প্রতিবাদে আমাদের পার্টির এই নির্বাচন ছেড়ে দেয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আমি নিজে আজকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এই নির্বাচনে যেয়ে লাভ হবে না। বরং অবৈধ সরকারকে আরও বৈধতা প্রদান করা হবে। এটা ৩০ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে ওই জাতীয় আরেকটি নির্বাচনের খেলা হবে। নির্বাচনের নামে প্রহসন হবে। এই প্রহসনের পার্ট হতে আমি ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী না। যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে দল করি, আমি দলের শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত মানি। সেজন্য আমি মনোনয়ন নিয়েছি, মনোয়নপত্র জমা দিয়েছি।’

মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে কার্যালয়ের সামনের সড়কে অনুসারীদের নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মিছিল করেন দক্ষিণের বিএনপির প্রার্থী ইশরাক।

আজ সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভা শেষে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করার কথা রয়েছে। দক্ষিণে ইশরাক হোসেন বিএনপির একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় তার ধানের শীষের টিকিট পাওয়া নিশ্চিত। অন্যদিকে উত্তরে বিএনপির দুজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় মেয়র প্রার্থী কে হচ্ছেন তা জানতে নেতাকর্মীদের অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়ন বোর্ডের সভার শেষে চূড়ান্ত ঘোষণার আগ পর্যন্ত। তবে তাবিথ আউয়াল মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদের দলীয় মনোনয়ন পেতে ২৮০ জন আগ্রহী প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে কাউন্সিলর পদে ২২০ এবং মহিলা সংরক্ষিত ওয়ার্ডের জন্য ৬০ জন প্রার্থী রয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদের দলীয় মনোনয়ন পেতে ১৯৬ আগ্রহী প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে কাউন্সিলর পদে ১৬২ এবং মহিলা সংরক্ষিত ওয়ার্ডের জন্য ৩৪ প্রার্থী রয়েছেন। কেন্দ্র মহানগরীর শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত মনোনয়ন কমিটি আগামীকাল রোববার আগ্রহী কাউন্সিল প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দলীয় সমর্থন দেবেন।

close

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here