করোনা: যোদ্ধা চিকিৎসকদের সুরক্ষায় অবহেলা কেন?

0
71

চিকিৎসক বার্নার্ড রিও’র কথা কি মনে আছে? নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু’র ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটি পড়া থাকলে নিশ্চয়ই চট করে মনে করতে পেরেছেন ডা. রিওকে। করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে আলোচনা হচ্ছে এর আগে বিশ্বব্যাপী একইভাবে ছড়িয়ে পড়া রোগ প্লেগ নিয়েও। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৩৪৬-১৩৫৩ সময়ে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের ৭৫ থেকে ২০০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে প্লেগে। মহামারী সেই কালো মৃত্যু বা মড়ক আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু; যা রচিত হয়েছে প্লেগে আক্রান্ত আলজেরিয়ার ওরাও অঞ্চলের মানবিক বিপর্যয়কে ঘিরে। উপন্যাসে দেখা গেছে, প্লেগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ওরাও শহরে দিনে দিনে বাড়ছে। আগে থেকে সচেতন না থাকা প্রশাসন শহর লকডাউন করেছে। রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে শহরজুড়ে। করোনার মতোই প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর মিছিল পাড়ায় পাড়ায়। প্রকৃতির এমন রুদ্ররূপ আর বিপর্যয়কে ওরাওয়ের প্রশাসন, অধিকাংশ মানুষ নিরুপায় হয়ে মেনে নিলেও কিছু মানুষ বরাবর এসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, একে জয় করতে চেয়েছে। প্লেগে আক্রান্ত শহর ওরাওয়ে সেই যুদ্ধের অগ্রভাগে ছিলেন ডা. বার্নার্ড রিও। শুধু উপন্যাসের রিও নয়, বাস্তবে চিকিৎসকরা যে কোনো রোগব্যাধি ও মহামারীর সময় এমন অগ্রসৈনিক হয়েই কাজ করেন। সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকলেও চিকিৎসার সময় রোগীর জীবনমরণের অংশ হয়ে যান চিকিৎসকরা। মিশে যান রোগীর সঙ্গে। দ্য প্লেগ উপন্যাসে, মাদার অথনের ছেলের চিকিৎসার সময় চিকিৎসক রিও শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, নিজেকে সপে দিয়েছিলেন মানবিক উদারতায়। অথনের ছেলে যখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সে সময়ের একটি চিত্র উপন্যাসে এভাবে এসেছে, ‘ছেলেটার নাড়ি টিপে ধরে যখন তিনি চোখ বুজছিলেন, তখন তিনি যেন অনুভব করছিলেন ছেলেটার নাড়ির উদ্দাম ভাবটা তার নিজের রক্তের উত্তাপের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। এভাবে ছেলেটার সঙ্গে একাত্মবোধ করার পর তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি যেন তার নিজের দেহের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকলেন।’ উপন্যাসে প্লেগের চিকিৎসক বার্নার্ড লিও’র মতো কিছু নাম এ করোনা মহামারীর সময় বাস্তবেও আমরা দেখছি, জানতে পারছি। উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং। রাতদিন রোগীদের সেবা দিতে দিতে ক্লান্ত লি শেষ পর্যন্ত করোনার ছোবলে ফেব্র“য়ারিতে মারা যান। করোনার চিকিৎসা দিতে গিয়ে মারা গেছেন পাকিস্তানের চিকিৎসক উসামা রিয়াজ। ইতালির হিউম্যানিটাস গাভাজেনি হসপিটালের ডা. ডেনিলে ম্যাকিনির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাসও আমাদের চোখে পড়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এখানে বাড়তি কোনো সার্জন নেই, ইউরোলজিস্ট নেই, অর্থোপেডিক্স নেই; আমরাই এ সুনামি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছি। আমি চিকিৎসকদের চোখে-মুখে যে ক্লান্তি দেখেছি, তাতেই বোঝা যায় কী পরিমাণ চাপ তাদের ওপর পড়েছে।’ আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসকরাও এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে কোয়ারেন্টিনে গেছেন। আতঙ্কিত হয়ে দু’-তিন দিন আগে বেসরকারি একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক ফোনে জানিয়েছেন, ‘তাদের হাসপাতালের ১০ জন চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত। তারা কোয়ারেন্টিনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দু’জনের অবস্থা ভালো না।’ কীভাবে তারা আক্রান্ত হলেন? সে জানাল, ‘একজন বিদেশফেরত করোনা আক্রান্ত রোগী তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের আইসিইউতে ছিলেন। তথ্য না থাকায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সতর্কতামূলক পিপিই’র ব্যবস্থা না করেই চিকিৎসার নির্দেশনা দেয়ায় তাদের এমন পরিণতি।’ এ চিকিৎসকের তথ্য অস্বীকার করতে পারিনি যখন এরকম আরও কিছু তথ্য পেয়েছি। যখন খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়ে অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখেছি। আমার সামনেই এক চিকিৎসককে হাসপাতালের সহকারী পরিচালকের কাছে ক্ষোভ জানাতে দেখেছি। করোনার মতো মহামারীর মানবিক বিপর্যয়ের মাঝে, মৃত্যু-রোগ-শোক-ব্যাধির বিরুদ্ধে যারা জীবনপণ লড়াই করে, তাদের মধ্যে চিকিৎসকরা থাকেন অগ্রভাগে। কিন্তু সম্মুখ সমরের যোদ্ধা সেই চিকিৎসকদের সুরক্ষায় আমরা কী করেছি? চীনের উহানে করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ প্রস্তুতির সময় পেয়েছে প্রায় ২ থেকে আড়াই মাস। কিন্তু এ সময়ে করোনা পরীক্ষার কিটের মজুদ, পরীক্ষার আওতা বাড়ানোর ব্যর্থতা ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা শুধু নয়, যারা করোনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়বেন সেই চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক-পিপিই’র পর্যাপ্ত মজুদই আমরা গড়তে পারিনি। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার রাত সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে দাবি করেছেন, চিকিৎসকদের যথেষ্ট সুরক্ষা সরঞ্জাম ও কিট মজুদ আছে। কিন্তু একইদিনে ভাষণের কয়েকঘণ্টা আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রজ্ঞাপনের কারণে প্রধানমন্ত্রীর দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়, যখন করোনাভাইরাসের উপসর্গ আছে- এমন রোগীকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) ছাড়াই প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় বলা হয়, ‘যদি কোনো রোগীর কোভিড-১৯’র লক্ষণ থাকে, তবে প্রথম চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেবেন এবং প্রয়োজনে পিপিই পরিধানকৃত দ্বিতীয় চিকিৎসকের কাছে প্রেরণ করবেন এবং তিনি পিপিই পরিহিত অবস্থায় রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করিবেন।’ এ নির্দেশনা সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করেছে অধিদফতর। এরপরও এতে তো আঁচ করাই যায় চিকিৎসকদের জন্য পিপিই’র যথেষ্ট মজুদ আছে কিনা সরকারের কাছে। এর আগে স্যার সলিমুল্লাহ হাসপাতালের পরিচালকের এক অফিস নোটিসে আমরা দেখেছি, চিকিৎসকদের সুরক্ষায় কতটা প্রস্তুত সরকার-হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সামান্য মাস্ক না দিতে পেরে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সেই পরিচালক বদলি হয়ে নতুন পরিচালক এসেছেন; কিন্তু কর্তাব্যক্তি বা নীতিনির্ধারকদের মানসিকতার কি পরিবর্তন হয়েছে? গত সোমবার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী পিপিই ও পরীক্ষা কিট হস্তান্তর করছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলাম, উহানের ঘটনার দুই আড়াই মাসেও কেন পিপিইর যথেষ্ট মজুদ করা সম্ভব হয়নি? মন্ত্রীর উত্তর ছিল, আগে তো প্রয়োজন ছিল না। এখন প্রয়োজন হয়েছে, এখন আনা হচ্ছে। কিন্তু তখন আনা হলে, এখন পিপিই নিয়ে চিকিৎসকদের মাঝে যে হাহাকার, কিছু চিকিৎসক যে আক্রান্ত হয়ে ঝুঁকির মুখে- সেই পরিস্থিতি কি রোধ করা যেত না অনেকটা? স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলেছেন, আরও কয়েক লাখ পিপিই আসছে। নীতিনির্ধারকদের পাশ কাটানোর এমন মানসিকতায় কি পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে না? অস্বীকারের এমন কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির কারণে চিকিৎসকদের ঢাল-তলোয়ার ছাড়া করোনার সামনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে না? বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে এমন অবস্থাই দেখা গেল। জারি করা সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘কোনো হাসপাতাল যদি রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা বা নতুন রোগীকে ভর্তি করাসহ চিকিৎসাসেবায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেয় তাহলে ভুক্তভোগীকে স্থানীয় সেনাবাহিনীর টহল পোস্ট বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানাতে হবে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ শেষ পর্যন্ত এ প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু এক অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি মিললেও আরেক পরিস্থিতিতে পড়ছেন তারা। এরই মধ্যে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেনস্থার শিকার হওয়ার খবর পেয়েছি। রাজবাড়ীতে এমন ঘটনার তথ্য মিলেছে। ওসি ভুল স্বীকার করায় বিষয়টির মিটমাটও হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের ব্যাধি ও মৃত্যুর মোকাবেলায় সারা বিশ্বেই ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা চিকিৎসকরা। পরাক্রমশালী শাসক, নীতিনির্ধারকরা এখানে শুধু ব্যবস্থাপক, সহায়ক ও নীতি পরিকল্পনাকারী। তাই এখন মূল কাজ, মজুদ পিপিই ও সরঞ্জাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথমে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা চিকিৎসকদের দেয়া। তাদের আগে করোনা নিয়ে সরাসরি কাজ না করা প্রশাসনের কেউ যেন পিপিই না পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কিছু ছবি নিয়ে সমালোচনা চলছে। এর পাশাপাশি চিকিৎসকরা কাজের ক্ষেত্রে রাস্তায়, হাসপাতালে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়েন, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এ সময়ে এমন কোনো আদেশ-নির্দেশ জারি করা উচিত হবে না, যেন চিকিৎসকদের মনোবল ভেঙে যায়। তবে আশার বিষয় পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। সমন্বিত কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। ভুল করলেও অনেক ক্ষেত্রে শুধরে নেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় আবারও ফিরে আসি আলবেয়ার কামুর উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’ ও ডাক্তার বার্নার্ড রিও’র কাছে। আলজেরিয়ার ওরাও শহরে প্লেগের বিরুদ্ধে সংগ্রামরতদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন ডা. রিও। অনেককে চিকিৎসা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন; কিন্তু এই যুদ্ধে তার জীবনেই ঘটে গেছে বড় ট্রাজেডি। প্লেগ আক্রমণের আগে ডা. রিও তার অসুস্থ স্ত্রীকে স্যানেটোরিয়াম বা স্বাস্থ্য নিবাসে পাঠিয়েছিলেন আরোগ্য লাভের আশায়। প্লেগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে একবার খোঁজ নেয়ারও সুযোগ পাননি স্ত্রীর। কিন্তু শেষে প্লেগের আক্রমণ যখন কমে আসে, ওরাও শহরের মানুষ যখন মুক্তির আনন্দে আনন্দ উৎসবে মাতে, শহরের প্রবেশপথ খুলে দেয়া হয়, তখন ডাক্তার রিও পান স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ। উপন্যাসের ড. রিও’র স্ত্রী বিয়োগ কিংবা বাস্তবের চিকিৎসক উহানের লি ওয়েনলিয়াং বা পাকিস্তানের উসামা রিয়াজের মৃত্যু-আত্মত্যাগ নিশ্চয়ই আমাদের মনে রাখা উচিত। তাই আবারও বলছি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা উচিত চিকিৎসকদের সুরক্ষা। সবকিছু সমন্বিত ও যার যা প্রাপ্য তা না দিতে পারলে অদৃশ্য ঘাতক কোভিড-১৯’র বিরুদ্ধে সর্বাÍক লড়াইয়ে জয়ী হওয়া কঠিন হবে। আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here